ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে কুর্দি গোষ্ঠীগুলো যেন জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারকে সতর্ক করেছে। বাগদাদ জানিয়েছে, যদি কুর্দি কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে ইরাকি ফেডারেল বাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।
ইরাকি, কুর্দি এবং তুর্কি কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে জানান, এই সপ্তাহের শুরুতে বাগদাদ কুর্দি কর্তৃপক্ষকে এ বার্তা দেয়। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে কুর্দি গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
আলোচনার সঙ্গে জড়িত এক ইরাকি কর্মকর্তা বলেন, ‘বাগদাদের বার্তা পরিষ্কার—কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানো যাবে না। যদি কেআরজি এটি ঠেকাতে না পারে, তাহলে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরাকি ফেডারেল বাহিনী মোতায়েন করা হবে।’
কুর্দি ও তুর্কি সূত্রও এ সতর্কবার্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা জানায়, কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার বর্তমানে বাগদাদ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর তীব্র চাপের মুখে রয়েছে, যাতে ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলো সীমান্ত পেরিয়ে সামরিক অভিযান চালাতে না পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি কুর্দি গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তেহরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়বে এবং এতে পুরো ইরাক আরও গভীরভাবে সংঘাতে জড়িয়ে যেতে পারে।
ইরান ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যদি ইরাকের কুর্দি অঞ্চল থেকে তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হয়, তবে তারা সেখানে কুর্দি ঘাঁটিতে আঘাত হানবে।
অন্যদিকে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলের কুর্দি সশস্ত্র আন্দোলনগুলোকে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এবং আঞ্চলিক সংঘাতে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে জড়ানোর যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছে।
কুর্দি নেতারাও প্রকাশ্যে এই যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার অবস্থান নিয়েছেন। কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী কুবাদ তালাবানি বলেন, কুর্দি বাহিনী কোনো অবস্থাতেই ইরানের ভেতরে কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা খুব স্পষ্টভাবে বলেছি—আমাদের বাহিনী কোনোভাবেই এতে জড়াবে না।’
এদিকে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তা ইরানের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে তেহরানের বিরুদ্ধে হামলায় উৎসাহিত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে কুর্দিদের একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে। তবে পরে তিনি বলেন, ‘আমি চাই না কুর্দিরা ইরানে ঢুকুক। তারা যেতে চায়, কিন্তু আমি তাদের বলেছি—এটি না করতে। যুদ্ধ ইতোমধ্যেই যথেষ্ট জটিল।’
এদিকে নির্বাসিত দুই কুর্দি সংগঠন—ফ্রি লাইফ পার্টি অব কুর্দিস্তান এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান—যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি।
এক বিবৃতিতে তারা পশ্চিম ইরানের কুর্দিদের স্থানীয় কমিটি গঠন করে প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ করার আহ্বান জানায়।
এক সিনিয়র কমান্ডার বলেন, ‘আমরা আমেরিকা বা ইরান—কোনো পক্ষেই দাঁড়াতে চাই না। আমাদের লক্ষ্য ভিন্ন—একটি গণতান্ত্রিক ও বিকেন্দ্রীকৃত ইরান, যেখানে কুর্দি ও অন্যান্য জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকবে।’
উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর মাধ্যমে এই সংঘাতের সূচনা করে। ওয়াশিংটনের দাবি, এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে দুর্বল করা।
অন্যদিকে ইরান এই হামলাকে অযৌক্তিক আগ্রাসন হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি মূলত তাদের সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা।
এরপর থেকে সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান পাল্টা হিসেবে ইসরাইলি ভূখণ্ড, যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন অবকাঠামোর ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ফলে আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও এই সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে পড়েছে।


